“বাজেট হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আয় ও ব্যয়ের পূর্বপরিকল্পিত আর্থিক বিবরণী। অর্থনীতিতে আয়-ব্যয়ের সম্পর্ক অনুযায়ী বাজেট ৩ প্রকার— উদ্বৃত্ত, সুষম ও ঘাটতি বাজেট; আর ব্যয়ের প্রকৃতি অনুযায়ী বাজেট ২ প্রকার— রাজস্ব বাজেট ও মূলধন বাজেট।
“বাজেট” শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি শব্দ Bougette থেকে ইংরেজি Budget শব্দটি সরকারের এক বছরের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
একটি দেশের বার্ষিক বাজেট শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। বাজেটের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান খাতে সম্পদের বণ্টন নির্ধারিত হয়।
সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী বাজেট অপরিহার্য। তাই বাজেটকে রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থনৈতিক রূপরেখা এবং উন্নয়নের পথনির্দেশক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে বাজেটের আকার- মোট বাজেট: ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা।
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য: ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা, বাজেট ঘাটতি: ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা
উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি): ৩.১৬ লাখ কোটি টাকা, ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৩.৬%।
বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হলো “গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা”। সরকারের লক্ষ্যগুলো খুবই চমৎকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ,ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি,সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা জিডিপি প্রবৃদ্ধি: ৬.৫%, মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য: ৭.৫%।
১. কৃষিখাতে বেশ কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। সার ও কীটনাশক আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
২. এদিকে ব্যবসার লাইসেন্স প্রদানে একক অনলাইন উইন্ডো (Single Window) চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। আবেদন থেকে লাইসেন্স প্রদান ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে আগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন্ড সুবিধা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পেও সম্প্রসারণ করার সুদূরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা করেছে বর্তমান সরকার।
৩. দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছে।পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক স্মার্ট সিটি নির্মাণের উদ্যোগ সহশিক্ষা ব্যবস্থায় AI অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেয়াটা খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হয়েছে।
৫. এদিকে অবকাঠামো ও উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বন্দর, লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যা সাধারণ মানুষের জন্য বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমতে পারে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা। ডিজিটাল ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে।
কিভাবে আমরা ঘাটতি বাজেট পূরণ করতে পারি সেটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে ঘাটতি (Deficit) থাকা মানেই খারাপ নয়। অনেক উন্নয়নশীল দেশই উন্নয়নের জন্য সীমিত মাত্রায় ঘাটতি বাজেট করে। বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা ঘাটতি, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬%। এই ঘাটতি দেশি ও বিদেশি ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদি এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়, তাহলে দেশের জন্য কয়েকটি বড় উপকার হতে পারে:
১. উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন: সরকার সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, রেলপথ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। এসব প্রকল্প ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে।
২. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে নির্মাণ, শিল্প ও সেবা খাতে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের আয় বাড়ে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়।
৩. অর্থনীতিতে গতি আসে: সরকার যখন অতিরিক্ত ব্যয় করে, তখন অর্থনীতিতে একটি “মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট” তৈরি হয়। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও ভোগ—সবই বাড়তে পারে।
৪. সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী হয়: বয়স্ক ভাতা, দরিদ্র সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।
যদি রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয় বা প্রকল্পে দুর্নীতি ও অপচয় হয়, তাহলে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন যে রাজস্ব সংগ্রহ ও বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্য অর্জিত না হলে প্রকৃত ঘাটতি আরও বড় হতে পারে।
ঘাটতি বাজেট দেশের জন্য উপকারী হতে পারে, যদি ধার করা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসনের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। তখন ভবিষ্যতে অর্থনীতি বড় হবে, রাজস্ব বাড়বে এবং সেই ঋণ পরিশোধ করাও সহজ হবে।
বাজেটের ঘাটতি দেশের জন্য উপকারী হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে দুদক এবং এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।
ঘাটতি বাজেটের অর্থের বড় অংশ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়। যদি প্রকল্পে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য বা অর্থ আত্মসাৎ কমানো যায়, তাহলে একই অর্থে বেশি উন্নয়ন সম্ভব হবে।
দুদক কার্যকর হলে সরকারি ক্রয়, টেন্ডার ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে। এতে বাজেট ঘাটতির চাপ কমবে। অর্থ পাচার রোধ এবং অবৈধ সম্পদ জব্দ করা গেলে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
বাজেটে প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রধান দায়িত্ব এনবিআরের। রাজস্ব বাড়লে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে।বড় করদাতা, অঘোষিত আয় ও কর ফাঁকি শনাক্ত করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব। অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন,ই-ভ্যাট ও স্বয়ংক্রিয় নজরদারির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি হ্রাস করা যায়।বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম মানুষ আয়কর দেন। নতুন করদাতা যুক্ত করতে পারলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
দুদক ও এনবিআর একসঙ্গে কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।দুর্নীতি কমবে,ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে।উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান বাড়বে।জনগণের করের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে।আইনের শাসন ও সুশাসন শক্তিশালী হবে।
এনবিআর সরকারের আয় বাড়ায়, আর দুদক সেই আয়ের অপচয় ও দুর্নীতি কমায়। এই দুই প্রতিষ্ঠান যত বেশি শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করবে, বাজেট ঘাটতি তত বেশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবে ।যদি দুদক ও এনবিআর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।
কর ফাঁকি কমে সরকারের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ায় জনগণের অর্থের অপচয় রোধ হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরও স্বচ্ছ ও ফলপ্রসূ হবে,
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে, যা একটি সমৃদ্ধ, দুর্নীতিমুক্ত ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।তাই সরকার প্রধানের মুখ্য চ্যালেঞ্জ হবে এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে এমন ভাবে দাঁড় করানো যেন দেশের মানুষ উপকৃত হয়। আর দেশের মানুষ উপকৃত হলে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান বিএনপি সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর ভাবমূর্তি আর উজ্জ্বল হবে।
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ ফজলুল হক
অতিরিক্ত সচিব,প্রশাসন(অবঃ)
পরিচালক, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি।









