পবিত্র রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তারাবির নামাজ। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা—অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও গুরুত্বের সঙ্গে তা পালন করেছেন।
তারাবির ফজিলত
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ রমজানে কিয়ামুল লাইল (তারাবি) আদায়ে উৎসাহ দিতেন। তিনি বলেছেন,
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানের কিয়াম আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৯
তারাবির সূচনা যেভাবে
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসুল (সা.) মসজিদে নামাজ আদায় করলে সাহাবিরা তাঁর অনুসরণ করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাতে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু চতুর্থ রাতে তিনি বের হননি। ফজরের পর তিনি বলেন, “আমি আশঙ্কা করেছি, এটি তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে যেতে পারে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১২
এ থেকেই বোঝা যায়, তারাবির নামাজের ভিত্তি সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
রাসুল (সা.) কত রাকাত পড়তেন?
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ও অন্যান্য মাসে ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না—এর মধ্যে ৮ রাকাত কিয়াম ও ৩ রাকাত বিতর।
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৭
মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যায় জানা যায়, তিনি দুই রাকাত করে নামাজ পড়তেন এবং অত্যন্ত দীর্ঘ কিরাত করতেন।
২০ রাকাত তারাবির প্রচলন
হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসল্লিদের এক জামাতে একত্রিত করে ২০ রাকাত তারাবির ব্যবস্থা করা হয়। সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, উমর (রা.) উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করেন এবং তারা ২০ রাকাত তারাবি ও ৩ রাকাত বিতর আদায় করতেন।
— আস-সুনানুল কুবরা
এতে বোঝা যায়, ২০ রাকাত জামাতে তারাবির প্রথা সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই চালু।
উমর (রা.) কেন রাকাত বাড়ালেন?
ইবনে তাইমিয়া বলেন, সাহাবিরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট অনুভব করতেন। তাই রাকাত সংখ্যা বাড়ানো হয়, যাতে প্রতি রাকাতে কিরাত কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা যায়। তিনি আরও বলেন, রাসুল (সা.) তারাবির রাকাতসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেননি; তাই কম-বেশি পড়া বৈধ।
— মাজমু আল-ফাতাওয়া
চার মাজহাবের মতামত
চার সুন্নি মাজহাবের অধিকাংশ আলেম ২০ রাকাত তারাবির পক্ষে মত দিয়েছেন:
-
আবু হানিফা — ২০ রাকাত
-
মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস শাফি — ২০ রাকাত
-
আহমদ ইবনে হাম্বল — ২০ রাকাত
-
মালিক ইবনে আনাস — ৩৬ রাকাত (মদিনার আমল অনুযায়ী)
ইমাম নববি বলেন, তারাবি সুন্নত এবং ২০ রাকাত ১০ সালামে আদায় করা হয়; একাকি বা জামাতে—উভয়ভাবেই জায়েজ।
-
তারাবি নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা, ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
-
৮ রাকাত, ২০ রাকাত বা ৩৬ রাকাত—সবগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
-
অধিকাংশ ফকিহ ২০ রাকাতের পক্ষে মত দিয়েছেন।
-
রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক না করে একাগ্রতা, দীর্ঘ কিরাত ও খুশুখুজু বজায় রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানের রাত ইবাদতের জন্য বিশেষ নিয়ামত। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি কিয়াম করা উত্তম; তবে কম পড়লেও গুনাহ নেই। মূল বিষয় হলো—ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা।









