ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

এবার নিজের যে ফাঁদে নিজেই ধরা ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির প্রভাব এখন শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্বজুড়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, ইসরায়েলের চাপ ও উসকানির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যার ফলে তিনি এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এই সামরিক অভিযান সত্যিই কতটা প্রয়োজন ছিল এবং এর শেষ পরিণতি কী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদৌ কোনো বড় ভূরাজনৈতিক সাফল্য বয়ে আনবে কি না, সেটিও এখন অনিশ্চিত।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জল, স্থল ও আকাশপথে ইরানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এর ফলে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে এর পরিণতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

হোয়াইট হাউসে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা ট্রাম্প সাধারণত বড় আকারের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। তিনি বরং দ্রুত ও সীমিত সামরিক অভিযানের পক্ষপাতী ছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক অভিযান কিংবা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত হামলার মতো পদক্ষেপও তিনি নিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ইরানে হামলা একটি জটিল ও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ফলাফল—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্ষমতায় এসে ‘অর্থহীন’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে তিনি এমন একটি সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছেন, যাকে অনেক বিশ্লেষক ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো বড় হুমকি না থাকলেও এই অভিযান শুরু করা হয়েছে—যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন দাবি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ নামে চালানো এই অভিযানের লক্ষ্য ও শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধের সাফল্য বা ‘জয়’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে—এ বিষয়েও প্রেসিডেন্টের বক্তব্য বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, অভিযানের লক্ষ্য স্পষ্ট—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনী অকার্যকর করা, প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।

তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানে সামরিক অভিযান নিয়ে সমালোচনা বাড়লেও ট্রাম্প এখনো তার রাজনৈতিক আন্দোলন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) সমর্থকদের বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন। তবে এই সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়লে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ—বিশেষ করে স্বতন্ত্র ভোটাররা—এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, “আমেরিকানরা ইরাক ও আফগানিস্তানের ভুল আবার দেখতে চায় না। মাগা সমর্থকদের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে—কেউ ট্রাম্পের ‘নতুন যুদ্ধ না করার’ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিলেন, আবার কেউ তার সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত।”

সংঘাত শুরুর পর ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের শাসকদের উৎখাত করাও একটি লক্ষ্য হতে পারে। তবে পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান এবং ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলা চালাতে উৎসাহ দেন। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন।

অন্যদিকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলসহ আশপাশের কয়েকটি দেশে আঘাত হেনেছে। এর উদ্দেশ্য হলো পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।

এছাড়া ইরানের মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, যা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত আকার দিতে পারে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম—ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সেখানে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও ট্রাম্প প্রকাশ্যে খুব বেশি উদ্বেগ দেখাননি। তবে তার প্রশাসন তেল সরবরাহে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উপায় খুঁজছে।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ জশ লিপস্কি বলেন, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে, যা আগে পুরোপুরি অনুমান করা হয়নি।”

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী মিত্রও এই অভিযানে বিস্মিত হয়েছে। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, “এটি মূলত একজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে।”

এদিকে উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব দেশ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

তবে সবাই ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিকে সমর্থন করছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর ট্রাম্পকে লেখা এক খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধ কতদিন চলবে। কারণ সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবও তত গভীর হবে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ