পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৯ মাসের জন্য বন্ধ হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণ। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হতে যাচ্ছে। যা বহাল থাকবে চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত।
জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার জানিয়েছেন, পর্যটক যাতায়াত বন্ধ থাকার সময়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সুরক্ষায় মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। এই কর্মসূচিতে দ্বীপটিকে কয়েকভাগে বিভক্ত করে প্লাস্টিক বোতলসহ ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে অভিযান চালানো হবে। এর বাইরে পর্যটক নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে বিশুদ্ধ খাবার পানি উৎপাদন ও সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রয়েছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও। একই সময়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় লোকজনকে সচেতন করার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রশাসনের।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে ২ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে মিটিং ডাকা হয়েছে। সেখানেই সেন্টমার্টিনের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ সুরক্ষায় মাসব্যাপী যে কর্মসূচি, তা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে। পর্যটক যাতায়াত বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় লোকজনের বিকল্প জীবিকার বিষয়টিও ভেবে দেখা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত গত দুই মাসে ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণের আগে অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করেন তারা। এরপর ট্রাভেল পাস নিয়ে সেন্টমার্টিন যেতে হয়েছে পর্যটকদের। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা দ্বীপটিতে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসবেন। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এ দুই মাস দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ও সেখানে রাত যাপনের সুযোগ রাখা হয়।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সেন্টমার্টিনের সুরক্ষার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আগে দ্বীপের বাসিন্দা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মীসহ অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করতে হবে। সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে ২৩০টি হোটেল-রিসোর্ট-কটেজ রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে। দ্বীপবাসীর কল্যাণে তাদের অবদান কতটুকু তা খতিয়ে দেখতে হবে। পর্যটন বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দ্বীপের মানুষের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আগে পর্যটকবাহী ১২টির বেশি জাহাজ সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে ভিড়লে শক্তিশালী পাখার ঘূর্ণিপাকে সমুদ্রতলের বালু নীল জলের স্বচ্ছ পানিতে মিশে ঘোলাটে আকার ধারণ করত। এসব ধুলাবালু, পলিথিনসহ বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতো প্রবাল-শৈবাল।
পর্যটক কমায় দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যটকের কারণে দ্বীপের কিছু প্রভাবশালী লাভবান হলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। অতিরিক্ত পর্যটকের উপস্থিতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে উল্টো তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাধারণত জুন, জুলাই, আগস্ট—এই তিন মাসে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় পর্যটক ও সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা সেন্টমার্টিনে তেমন যান না। এই সময়টাতে প্রভাবশালীরা দ্বীপের ভ্রমণ নিষিদ্ধ এলাকায় রিসোর্টসহ নানা অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে আসছেন। এসব স্থাপনায় ব্যবহৃত হয় সৈকত থেকে তুলে আনা পাথর।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এবার যাতে পর্যটক না থাকার সময়ে কেউ এ ধরনের স্থাপনা তৈরি করতে না পারেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।








