ঢাকা, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

বাজেট নিয়ে ফজলুল হক এর আলোচনা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎবাজেট। Depict Budget. Expenditure >Income. অর্থমন্ত্রী- আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী MP গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেন।

বাজেটের আকার:
মোট বাজেট: ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য: ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা
বাজেট ঘাটতি: ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা
উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি): ৩.১৬ লাখ কোটি টাকা
ঘাটতি: জিডিপির প্রায় ৩.৬%।

১.বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হলো “গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা”। সরকারের লক্ষ্যগুলো খুবই চমৎকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি, সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা জিডিপি প্রবৃদ্ধি: ৬.৫%, মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য: ৭.৫%।

২. কৃষিখাত দেশের অর্থ্নীতির মেরুদন্ড । মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট্।সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ্ । সে দিকে বিবেচনায় রেখে এবারের বাজেটে এ খাতে বেশ কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। সার ও কীটনাশক, আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।রপ্তানিমুখী শিল্পেও সম্প্রসারণ করার সুদূরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা করেছে বর্তমান সরকার। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছে।পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা, যা নগদ অর্থের প্রবাহকে বৃদ্ধি করবে ।অ্ন্য্ দিকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

২. আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক স্মার্ট সিটি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।শিক্ষা ব্যবস্থায় AI অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেয়াটাকে খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

৩. অবকাঠামো ও উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামুদ্রিক বন্দর ও নৌবন্দর, লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যা সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন সূচনা করবে।কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমাতে,কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে।ডিজিটাল ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে।

৪. ঘাটতি বাজেট নিয়ে সমালোচনার কোন অবকাশ নেই । কিভাবে আমরা ঘাটতি বাজেটকে মোকাবেলা করতে পারি ।জনগণের উপর ট্যাক্সের ভার না চাপিয়ে কিভাবে Direct & Indirect Tax এর পরিধি বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে ।NBR (National Boar of Revenue)কে ঈগলের দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। কোথায় এবং কারা কর ফাঁকি দিচ্ছে সেখানে হাত দিতে হবে। এখানে আমি দু’টি দিক তুলে ধরছি। যেখান থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা Tax আসতে পারে । যেমন- বড় বড় বহুতল ভবনের গাড়ীর গ্যারেজ গোডাউন হিসেবে ব্য্বহ্নত হচ্ছে অথচ Tax এর আওতায় নেই ।

গুলশান-বনানীসহ ঢাকা শহরের নামী-দামী এলাকায় রেসিডেনসিয়াল বহুতল ভবনে অফিস ভাড়া দিয়ে বাড়ীর মালিকগণ বছরে লক্ষ্ লক্ষ্ টাকা আয় করছে । কিন্ত সেখানে বাড়তি অর্থের Tax প্রদান করছে না । ভ্যাটের ক্ষেত্রে শুধু মিষ্টির দোকান গুলো মিষ্টির উপর সাধারণ জনগণ থেকে ১৫% ভ্যাট আদায় করলেও সরকারকে মাসিক সামান্য্ টাকা প্রদান করছে ।যা কিছু অসৎ কর্ম্কর্তা ও কর্ম্চারীর কারণে ঘটছে । যখন ম্যাজিষ্ট্রে হিসেবে কাজ করেছি বাস্তব অভিজ্ঞ্তা শেয়ার করলাম ।সে কারণে রাজস্ব আয়ের পরিধি বাড়াতে হবে ।যারা ট্যাক্ম দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্য্বস্থা নিলে হবে না ।

সাধারণ মানুষকে ট্যাক্সের ভয় দেখিয়ে নয় । ট্যাক্স হচ্ছে জাকাতের ন্যায় বাধ্য্ তামূল ও সম্মানজনক এটা বুঝাতে হবে এবং অসৎ কর্ম্চারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্য্বস্থা নিতে হবে। বাজেটে ঘাটতি (Deficit) থাকা মানেই খারাপ নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নয়নের স্বার্থে ঘাটতি বাজেট করতে হয় । বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা ঘাটতি, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬%। এই ঘাটতি দেশি ও বিদেশি ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদি এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়, তাহলে দেশের জন্য কয়েকটি বড় উপকার হতে পারে:
১. উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নসরকার সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, রেলপথ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। এসব প্রকল্প ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে।

২. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে নির্মাণ, শিল্প ও সেবা খাতে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের আয় বাড়ে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়।

৩. অর্থনীতিতে গতি আসে
সরকার যখন অতিরিক্ত ব্যয় করে, তখন অর্থনীতিতে একটি “মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট” তৈরি হয়। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও ভোগ—সবই বাড়তে পারে।

৪. সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী হয়
বয়স্ক ভাতা, দরিদ্র সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।
যদি রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয় বা প্রকল্পে দুর্নীতি ও অপচয় হয়, তাহলে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন যে রাজস্ব সংগ্রহ ও বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্য অর্জিত না হলে প্রকৃত ঘাটতি আরও বড় হতে পারে।

**ঘাটতি বাজেট দেশের জন্য উপকারী হতে পারে, যদি ধার করা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসনের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। ভবিষ্যতে অর্থনীতি বড় হবে, রাজস্ব বাড়বে এবং সেই ঋণ পরিশোধ করাও সহজ হবে।

বাজেটের ঘাটতি দেশের জন্য উপকারী হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে দুদক এবং এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর। ঘাটতি বাজেটের অর্থের বড় অংশ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়। যদি প্রকল্পে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য বা অর্থ আত্মসাৎ কমানো যায়, তাহলে একই অর্থে বেশি উন্নয়ন সম্ভব হবে। সৎ, দক্ষ্ ও আইন চর্চায় নিয়োজিত, অর্থ্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট্ অভিজ্ঞ্ মেধাবী, অনুসন্ধিৎসু কর্ম্কর্তাকে দুদক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বসাতে হবে । তবেই কেবল দেশের উন্নয়ন ত্বরান্থিত ও কার্যকর হবে ।কমিশন খাওয়া কর্ম্কর্তা দিয়ে দুদক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চলতে পারে না

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ