ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

রাজধানীর যানজটে প্রতিদিন ১৪০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি

রাজধানী ঢাকায় সড়কে শৃঙ্খলার অভাব ও সমন্বয়হীনতার কারণে দিন দিন বাড়ছে যানজট, আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে যানজটের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে দেশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অদক্ষতাই এই সংকটের মূল কারণ। এই সমস্যা নিরসনে ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গঠন করা হয় ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)। তবে আইনি ক্ষমতা থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।

তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পরিবহন পরিকল্পনা, প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব ডিটিসিএর ওপর ন্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিএমটিসিএলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে প্রতিদিনই নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টা, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি।

গত ১৪ মার্চ গাজীপুরে এক সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, শুধুমাত্র যানজটের কারণেই রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, গত বছরের ২৬ জুন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর এক সেমিনারে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মঈনুদ্দিন বলেন, যানজটজনিত বার্ষিক ক্ষতির অর্থ দিয়ে প্রতি বছর অন্তত দুটি করে মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ করা সম্ভব।

ডিটিসিএর অধীনে ২০১৬ সালে অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, মেট্রোরেল, বিআরটি এবং সড়ক নেটওয়ার্ক সমন্বিত করে একটি আধুনিক নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ডিটিসিএর অভিযোগ, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না।

ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক ধ্রুব আলম জানান, “আমরা সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকলেও অন্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতার অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ছি।”

বাস রুট নির্ধারণ নিয়েও দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব। যানজট কমাতে ডিটিসিএ ৪২টি নির্ধারিত রুটের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেও একই সময়ে ট্রাফিক পুলিশ আলাদা উদ্যোগে নতুন রুট নির্ধারণ করেছে, যা ডিটিসিএর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইন অনুযায়ী ডিটিসিএর সঙ্গে সমন্বয় করে রুট নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে একাধিক সংস্থা পৃথকভাবে রুট অনুমোদন দিচ্ছে, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা।

ডিটিসিএর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, “পরিকল্পনা নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের হলেও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশই উদ্যোগ নিচ্ছে। আমরা চাই, তারা পরিকল্পনা করলেও যেন আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে।”

এদিকে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হক বলেন, “ডিটিসিএর উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে আসছে। তবে সব সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলে রাজধানীতে যানজটমুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।”

সব মিলিয়ে, রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধানে কার্যকর সমন্বয় ও শক্তিশালী বাস্তবায়ন ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ