জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে রাজপথে যে স্লোগানটি সবচেয়ে বেশি ধ্বনিত হয়েছিল—‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, সেটিই দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে ফেসবুকে রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রসংগঠনের কর্মী ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের পোস্টে পোস্টে ঘুরছে এই স্লোগান। ভাষা ও রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরে সাম্প্রতিক এক বিতর্কের জের ধরেই এর নতুন করে ট্রেন্ডিং শুরু হয়েছে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সিরাজগঞ্জে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্লোগানটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বাংলা ভাষাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলতে পারে না, কারণ ‘ইনকিলাব’ বাংলা শব্দ নয়। তার এ বক্তব্যের ভিডিও ও সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব-এর তথ্যমতে, ১৯২১ সালে উর্দু কবি ও কমিউনিস্ট নেতা মাওলানা হাসরাত মোহানি প্রথম এই স্লোগান ব্যবহার করেন। তিনি ছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।
পরবর্তীতে বিপ্লবী নেতা ভগত সিং এই স্লোগানকে জনমানসে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের সময় তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেন। আদালতে দেওয়া তার জবানবন্দিতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিপ্লব মানে কেবল অস্ত্রধারণ নয়; বরং অন্যায় ও শোষণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করা।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘ইনকিলাব’ শব্দের অর্থ বিপ্লব এবং ‘জিন্দাবাদ’ অর্থ দীর্ঘজীবী হোক বা অভিনন্দন। ফলে স্লোগানটির সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায়—‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। ইতিহাসে এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
টুকুর বক্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদল মনে করছে, ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিদেশি শব্দভিত্তিক স্লোগান পরিহার করা উচিত। অন্যদিকে বড় একটি অংশের যুক্তি—সংগ্রামের ইতিহাসে যে শব্দ গাঁথা হয়ে যায়, তা আর নির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে জনগণের সম্মিলিত চেতনার অংশ। এই দ্বিমুখী অবস্থানেই এখন সরগরম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।








