বাবা ছিলেন জিয়াউর রহমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এবার কি ছেলে যাচ্ছেন তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে? এমন জোরালো আলোচনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. এম এ মুহিতকে ঘিরে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ড. এম এ মুহিত। জনস্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধিতা এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশে-বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। দলীয় ও নীতিনির্ধারণী একাধিক সূত্র বলছে, আসন্ন মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ—এই দুই মন্ত্রণালয়ের যেকোনো একটিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ড. মুহিতের মতো অভিজ্ঞ গবেষক-প্রশাসকের অন্তর্ভুক্তি সরকারকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
ড. এম এ মুহিতের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বাবা অধ্যাপক এম এ মতিন ছিলেন জিয়াউর রহমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং নিজ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত ছিলেন।
বাবার সেই রাজনৈতিক আসন থেকেই এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ড. মুহিত। ফলে অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন—একই পরিবার থেকে দুই প্রজন্মের স্বাস্থ্যখাতে নেতৃত্বের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ড. এম এ মুহিতের একাডেমিক ও গবেষণা জীবন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি লন্ডনের University College London থেকে এমএসসি এবং London School of Hygiene & Tropical Medicine থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন জার্নালে তার ১৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জনস্বাস্থ্য নীতি, প্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে তার গবেষণা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গবেষণা-ভিত্তিক নীতিনির্ধারণে তার অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর সংস্কার আনতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু গবেষণায় নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বেও তিনি সক্রিয়। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান এবং নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া Asian Institute of Disability and Development (AIDD) এবং Child Disability Network–এর মতো প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি CSF Global–এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নেপালে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
The Global LMIC Cerebral Palsy Register (GLM-CPR) নেটওয়ার্কে নীতিনির্ধারক হিসেবে তার সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২৮টি দেশের ৮০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়ে গঠিত এই নেটওয়ার্কে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ড. মুহিত ‘প্রফেসর মতিন আই কেয়ার সিস্টেম’-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১১টি আধুনিক চক্ষু হাসপাতাল পরিচালনা করছেন। এছাড়া শাহজাদপুরে একটি মা ও শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন।
শাহজাদপুর, রাজশাহী, নওগাঁ ও সাঁথিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো অন্ধত্ব প্রতিরোধ, চক্ষু চিকিৎসা এবং মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবনির্বাচিত সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা গঠন ও দায়িত্ব বণ্টন করা হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ড. এম এ মুহিত কি বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, নাকি সমাজকল্যাণ খাতে নতুন অধ্যায় সূচনা করবেন?
জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, গবেষণায় সাফল্য এবং তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তব কাজ—সব মিলিয়ে ড. এম এ মুহিতকে সম্ভাবনাময় নীতিনির্ধারক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
যদি তিনি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন, তবে স্বাস্থ্যখাতে প্রমাণভিত্তিক নীতি, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন সবার নজর মন্ত্রিসভা ঘোষণার দিকে—ইতিহাস কি নতুন করে পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি ড. মুহিত নিজস্ব পরিচয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবেন, সেটিই দেখার বিষয়।








