ঢাকা, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

ত্যাগ-সংগ্রাম-আদর্শে অবিচল এক নাম: ভিপি শামসুর রহমান

বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা পদ-পদবির চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখেছেন; ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দল ও দেশকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সাঁথিয়া উপজেলার রাজনীতিতে তেমনই এক পরিচিত, পরীক্ষিত ও সংগ্রামী নাম—ভিপি শামসুর রহমান।

১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। সে সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন, আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এবং সাহসী নেতৃত্ব তরুণ শামসুর রহমানকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই আদর্শের টানে তিনি রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ বেছে নেন—যে পথ কেবল সাহসী ও আত্মত্যাগী মানুষের জন্য।

ছাত্রজীবনে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা ও তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে দ্রুতই নিজেকে প্রমাণ করেন। বেড়া ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সংগঠনকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেন।

১৯৯০ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি ছিল শুধু একটি পদ নয়, বরং ছাত্রসমাজের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিফলন।

আশির দশকের উত্তাল সময়ে, বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-বিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। রাজপথে মিছিল, সমাবেশ, প্রতিবাদ—সবখানেই ছিলেন সক্রিয়। জেল-জুলুম, মামলা-হামলা, প্রশাসনিক নির্যাতন—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি।

অনেকে যখন নিরাপদ জীবন, ভালো চাকরি কিংবা ব্যবসার মোহে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন, তখন শামসুর রহমান বেছে নিয়েছেন সংগ্রামের কঠিন পথ। আদর্শের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি।

পরবর্তীতে তিনি বেড়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং পাবনা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতি শেষ হলেও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা থেমে থাকেনি; বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে।

দলকে সুসংগঠিত করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তিজীবনে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে সংগঠনের পেছনে ব্যয় করেছেন—যা আজকের দিনে বিরল দৃষ্টান্ত। পরিবার থেকে বারবার বিদেশে পাড়ি জমানোর চাপ এলেও তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। তাঁর কাছে রাজনীতি কখনো অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং ছিল আদর্শিক দায়বদ্ধতা।

১৯৯৬-পরবর্তী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দমন-পীড়ন, মামলা-হামলার মধ্যেও তিনি সাঁথিয়া উপজেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কাউন্সিলে বিপুল ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। টানা তিনবার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে পাবনা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সফলভাবে।

দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি দু’বার উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেন। ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েও প্রশাসনিক পক্ষপাত ও ভোট কারচুপির অভিযোগে প্রত্যাশিত বিজয় পাননি। কিন্তু পরাজয় তাঁকে হতাশ করেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে।

গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন রাজপথের একজন অগ্রসেনানী। বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া-র মুক্তির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন।

তাঁর সহযোদ্ধাদের ভাষায়—“শামসুর রহমান কখনো পেছনে থাকেননি; সামনে থেকেই লড়েছেন।”

দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দল তাঁকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়। এটি ছিল তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন। কিন্তু প্রশাসনিক পক্ষপাত, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও কালো টাকার ছড়াছড়ির মধ্যে প্রত্যাশিত ফল আসেনি।

তবে তাঁর সমর্থকদের দৃঢ় বিশ্বাস—তিনি প্রকৃত অর্থে পরাজিত হননি; বরং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে পরাজিত করা হয়েছে। কারণ সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির প্রাণশক্তি হিসেবে তিনি এখনও অটল, অবিচল।

সাঁথিয়া উপজেলায় ছাত্রদল থেকে উঠে আসা বহু যোগ্য নেতা থাকলেও, ভিপি শামসুর রহমানের মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতার যথাযথ মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।

দলের শীর্ষ পর্যায়ে—সংসদের উচ্চ কক্ষ, মন্ত্রিপরিষদ বা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে—তাঁকে মূল্যায়ন করা হলে তা হবে শুধু একজন ব্যক্তির প্রাপ্তি নয়; বরং তা হবে তৃণমূলের কর্মীদের বিজয়, হবে শহীদ জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত লাখো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি।

ভিপি শামসুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আদর্শ, ত্যাগ ও নিষ্ঠা কখনো বৃথা যায় না। সময় হয়তো দেরি করে, কিন্তু ইতিহাস সত্যিকার যোদ্ধাদেরই মনে রাখে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ