ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

অবশেষে বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপনকারী ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান East India Company আবারও চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে গেল। সাম্প্রতিক সময়ে দেউলিয়া ঘোষণার পর লন্ডনভিত্তিক বিলাসপণ্যের ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হওয়া প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটি অবসায়ন (লিকুইডেশন) প্রক্রিয়া শুরু করতে লিকুইডেটর নিয়োগ করে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল গ্রুপের কাছে প্রতিষ্ঠানটির দেনা জমেছিল ছয় লাখ পাউন্ডের বেশি। এছাড়া কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের কাছে দেড় লাখ পাউন্ডেরও বেশি পাওনা বকেয়া ছিল। আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পেরে শেষ পর্যন্ত লন্ডনের মেফেয়ারের দোকান বন্ধ হয়ে যায়, অচল হয়ে পড়ে ওয়েবসাইটও।

প্রায় দেড়শ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া এই কোম্পানিকে ২০১০ সালে নতুনভাবে জীবন দেন ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী Sanjeev Mehta। একবিংশ শতকের শুরুতে তিনি কোম্পানির নামের স্বত্ব কেনার উদ্যোগ নেন এবং ২০১০ সালে লন্ডনের মেফেয়ারে একটি দোকান চালু করেন। সেখানে উচ্চমানের চা, চকোলেট, মিষ্টান্ন, মসলা ও অন্যান্য বিলাসপণ্য বিক্রি করা হতো।

২০১৭ সালে The Guardian-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেছিলেন, “একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক—এটাই প্রমাণ করে যে নেতিবাচক বিষয়টি এখন ইতিবাচক হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।”

তবে নতুন ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের রানি Elizabeth I-এর জারিকৃত রাজকীয় সনদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সে সময় ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সম্মিলিতভাবে ‘ইস্ট ইন্ডিজ’ বলা হতো। মসলা, রেশম, তুলা ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এটি একটি জয়েন্ট-স্টক ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

১৬১২-১৩ সালে সুরাটে প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ভারতে তাদের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি শুরু হয়। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি শুধু বাণিজ্যিক শক্তিই নয়, বরং সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। নিজস্ব প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের বাহিনী গড়ে তোলে তারা এবং ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়।

১৭৫৭ সালের Battle of Plassey ছিল তাদের ক্ষমতা বিস্তারের বড় মোড়। এই যুদ্ধের পর বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে কোম্পানি। কর আদায়, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তারা কার্যত একটি শাসক শক্তিতে পরিণত হয়। বিশ্ববাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ—বিশেষত চা, নীল, মসলা ও বস্ত্র—তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

তবে এই বিস্তারের পেছনে ছিল ব্যাপক শোষণ ও বঞ্চনা। কৃষকদের অর্থকরি ফসল চাষে বাধ্য করা, কঠোর করনীতি এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। বাংলার দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা কোম্পানির শাসনকে ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ১৮৫৮ সালে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয় এবং ব্রিটিশ রাজের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

একসময় যে কোম্পানি ভারত শাসন করত, পরবর্তীতে সেটিই একজন ভারতীয় উদ্যোক্তার মালিকানায় ফিরে আসে—এ বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনেকেই এটিকে ইতিহাসের এক প্রতীকী পালাবদল হিসেবে দেখেছিলেন।

তবে আর্থিক সংকটে পড়ে পুনরুজ্জীবিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই চূড়ান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়া যেন ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের আরেকটি পরিসমাপ্তি।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ