ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পাবনা-১ : স্বাধীনতার পর নজিরবিহীন বিজয়ী এমপি এবার বিরোধী দলে

সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি ছিল পাবনা-১। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর এখানে বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ২০ বছর পর আসন পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শেষ পর্যন্ত নাটকীয় লড়াইয়ে বিজয়ের হাসি ফুটেছে জামায়াত শিবিরে; আর হতাশায় ডুবেছে বিএনপি।

পাবনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শামসুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ২৪৫ ভোট। ফলে ২৫ হাজার ৭২৯ ভোটের বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় মোমেনের।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম এ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কারণ আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত, আর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ‘ট্রেন্ড’-এ এসেছে ব্যতিক্রম।

স্বাধীনতার পর থেকে পাবনা-১ আসনকে ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতীতে দেখা গেছে, যে দল এ আসনে জয়ী হয়েছে, কেন্দ্রেও তারাই সরকার গঠন করেছে। শুধু তাই নয়, বিজয়ী সংসদ সদস্যরা প্রায় সবাই মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেয়েছেন।কিন্তু এবারের ফল সেই ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে ভোট শেষ হলেও আলোচনা থামেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ ছিল আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। আগে পুরো সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়ন এবং বেড়া পৌরসভা নিয়ে গঠিত ছিল পাবনা-১। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে উচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন শুধু সাঁথিয়া উপজেলাকে নিয়ে আসন নির্ধারণ করে।

এই সিদ্ধান্তে জামায়াত খুশি হলেও বিএনপি ক্ষুব্ধ হয়। কারণ বেড়া উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সীমানা পরিবর্তনের ফলে সেই ভোটব্যাংক থেকে বঞ্চিত হয় বিএনপি প্রার্থী।

সাঁথিয়া এলাকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের প্রভাব দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এ আসনে জয়ী হয়েছিলেন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী। তার ব্যক্তিগত প্রভাব ও সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো এলাকায় কার্যকর বলে মনে করেন অনেকে।

নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান মোমেন নতুন মুখ হলেও নির্বাচনের আগে এলাকায় ব্যাপক জনসংযোগ করেন এবং দলীয় কর্মীদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ নেতাও তার পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন সরব উপস্থিতি দেখা যায়নি। পাশাপাশি দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং সমন্বয়ের অভাবও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

পরাজয়ের পর বিএনপি প্রার্থী শামসুর রহমান অভিযোগ করেছেন, তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার। তার দাবি, কয়েকটি কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে, কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং প্রশাসন নীরব থেকেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

ইতিহাস বলছে যা

পাবনা-১ আসনের অতীত ফলাফলও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৭৩ সালে জয়ী হন আবু সাইয়িদ (আওয়ামী লীগ)।

১৯৭৯ সালে বিএনপির মির্জা আব্দুল আউয়াল।

১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মেজর (অব.) মনজুর কাদের।

১৯৯১ ও ২০০১ সালে মতিউর রহমান নিজামী।

১৯৯৬ সালে আবার আবু সাইয়িদ।

২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত জয়ী হন শামসুল হক টুকু।

১৯৭৯ সালের পর আর কখনো বিএনপি এ আসনে জয় পায়নি—এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

জামায়াত সমর্থকদের দাবি, ২০ বছর আগের তুলনায় দল এখন বেশি সংগঠিত ও সুসংহত। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, প্রার্থী নির্বাচনে কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর প্রচারণাই তাদের বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।

অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত ভুল ও সমন্বয়হীনতায় হারতে হয়েছে তাদের।

সব মিলিয়ে পাবনা-১ এবার শুধু একটি আসনের ফল নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ভোট শেষ হলেও বিশ্লেষণ চলছে—এই ফলাফল ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ